ভারতের জাতীয় গ্রন্থগার , বেলভেডিয়ার রোড, আলিপুর, কলকাতা
কলকাতার আলিপুরে জাতীয় গ্রন্থাগারে গত ১৪ ও ১৫ ই মে, ২০২৫ অনুষ্ঠিত হল অখিল ভারতীয় প্রবুদ্ধ মঞ্চ প্রজ্ঞাপ্রবাহের পশ্চিমবঙ্গ শাখা লোকপ্রজ্ঞার সাংগঠনিক কর্মশালা ও একবিংশতম অনুভব দর্শন। বৈঠক ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গের প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি। অনুভব দর্শনে এঁরা ছাড়াও নির্বাচিত কিছু প্রবুদ্ধ ব্যক্তি অংশ নেন। ১৪ তারিখ সন্ধ্যায় সূচিত প্রান্তবৈঠকত্রয়ের মধ্যে মধ্যবঙ্গের বৈঠক জাতীয় গ্রন্থাগারে এবং অপর দুই প্রান্তের বৈঠক কলকাতার ২৬ বিধান সরণীস্হ প্রজ্ঞামন্দিরে, সংশ্লিষ্ট প্রান্ত সংযোজক ও সহ সংযোজকের তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়। ১৫ তারিখ সকাল ৮.০০ থেকে জাতীয় গ্রন্থাগারে শুরু হয় তিন প্রান্ত সংযোজক ও সহ সংযোজকদের মিলিত সাংগঠনিক বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞাপ্রবাহের অখিল ভারতীয় সংযোজক ডঃ জগন্নাথ নন্দকুমার, প্রজ্ঞাপ্রবাহের পূর্বক্ষেত্রের সংযোজক অরবিন্দ দাশ এবং লোকপ্রজ্ঞার রাজ্য সংযোজক ডঃ সোমশুভ্র গুপ্ত।
চা-পান পরবর্তী কালাংশের বৈঠকে উক্ত তিন মুখ্য কার্যকর্তাসহ তিন প্রান্তের সংযোজক সহ-সংযোজক, মাতৃশক্তি ও বিভিন্ন শৈক্ষণিক বিভাগের প্রমুখ অংশ নেন। ডঃ নন্দকুমারজি ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরার ক্ষেত্রে উন্নতমানের গবেষণা ও প্রসারের জন্য দেশের শ্রেষ্ঠ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সমন্বয়ে নির্মিত সংস্থা ‘ইকশা’ (IKSHA) এবং উক্ত ক্ষেত্রে পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল স্তরে গবেষণাপত্র প্রস্তুতের উদ্দ্যেশ্যে নির্মিত দিকশা (DIIKSHA) প্রকল্পের বিষয়ে আলোকপাত করেন। এছাড়া প্রজ্ঞাপ্রবাহের নবপ্রকাশিত নিউজলেটার ‘বিচারপ্রবাহ’র বিষয়ে সকলকে তিনি অবহিত করেন। স্বল্পাহার পরবর্তী কালাংশে কর্মশালা আয়োজিত হয় তাতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য, আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রের সৃষ্টি, কার্যকর্তার গুণাবলী ইত্যাদি বিষয়ে ডঃ নন্দকুমারজি বক্তব্য রাখেন। সংঘের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রবীণ সংঘ প্রচারক ও কবি রঙ্গা হরির এক কাব্যিক উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “ours is the evolution of life mission of the Hindu nation”। ভারতীয় ধারণার ওপর বৃটিশ দৃষ্টিভঙ্গির নেতিবাচক প্রভাব, পঞ্চ পরিবর্তন, স্ব,ব্যক্তি ও সমাজ নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। তিনি ঋগ্বেদের ৯ম মণ্ডল, ৬৩তম সূক্ত এর অন্তর্গত ৫ম মন্ত্র, “কৃণ্যন্তু বিশ্বমর্যম্ অপঘ্নন্তোরাব্ণঃ” উল্লেখ করে বলেন একমাত্র ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিই যথাযথ অর্থে সমগ্র জগতের কল্যাণকামনা করে।
মধ্যাহ্নভোজন পরবর্তী কালাংশে অনুষ্ঠিত হয় লোকপ্রজ্ঞার একবিংশতম অনুভব দর্শন। অনুষ্ঠানের বিষয়ভাবনা ছিল ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা। কার্যক্রমের সূচনায় বক্তব্য রাখেন ডঃ নন্দকুমারজি। ‘ভারতীয় জ্ঞান’ এই নামটির বিশ্লেষণ দিয়েই ডঃ নন্দকুমারজি ভারতীয় নামকরণ শৈলীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, পাশ্চাত্য দেশে যেমন বাহ্যিক রূপ দেখে নামকরণ করা হয় ভারতে তা হয় অন্তরের গুণ থেকে। যেমন ‘ভা’ শব্দটি জ্ঞান বা আলো নির্দেশ করে, (উদাহরণস্বরূপ ‘ভাস্বৎ’ দীপ্তিমান বা ‘ভান’ আলোকসম্পাত)। ‘রত’ শব্দটির অর্থ নিবেদিত বা নিয়োজিত। অর্থাৎ যেখানে জ্ঞানচর্চায় নিরত নিয়োজিত মানুষগণ বাস করেন সেই দেশই হল ভারত। এরপর ‘জ্ঞান’ শব্দটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন পাশ্চাত্য যেমন জ্ঞানের সীমিত কিছু স্তর আছে, ভারতে এর পরিধি এতই বিশাল যে তাদের তিনটি প্রকারে ভাগ করা হয়েছে, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রজ্ঞান। সুতরাং ভারতীয় জ্ঞান বলতে শুধুই ধর্মীয় জ্ঞান নয়। এরপর তিনি গণিত, বিজ্ঞান, কলা ইত্যাদি বিবিধ ক্ষেত্রে ভারতীয় পারম্পরিক জ্ঞানের উৎকর্ষের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এবং নালন্দা, তক্ষশিলা প্রভৃতি বিভিন্ন প্রাচীন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় সেসব বিষয় চর্চার পীঠস্থান ছিল তার উল্লেখ করেন। এই উৎকর্ষ ইসলামিক আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে আবার এর উত্থান ঘটতে শুরু করে যখন নবগোপাল মিত্রর উদ্যোগে ‘হিন্দু মেলা’ সূচিত হয়, রচিত হয় একের পর এক গুরুত্ৱপূর্ণ গ্রন্থ যেমন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ‘A History of Hindu Chemistry’, গিরীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘Ancient Hindu Surgery’, বিভূতিভূষণ দত্ত ও অবধেশ নারায়ণ সিং এর ‘History of Hindu Mathemstics’, বিনয়কুমার সরকারের ‘Hindu View of Sociology’ ইত্যাদি। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের পর থেকে এই জ্ঞানচর্চার গতি রুদ্ধ হতে থাকে। কমিউনিস্ট কার্যকলাপ দেশজুড়ে বড় আকার ধারণ করে। রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের যে সংবিধান ১৯৪৯ এর ২৬শে নভেম্বর গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ এর ২৬শে জানুয়ারি কার্যকর হয়, তার প্রথম ধারায় (Article 1) যদিও বলা হয়েছে, “India, that is Bharat, shall be a Union of States”, বর্তমানেও ভারতে ঔপনিবেশিক মানসিকতা অবশিষ্ট রয়ে গেছে। এই মানসিকতা দূর করে ভারতীয় পারম্পরিক জ্ঞান আহরণের কাজটি আবার নতুন ভাবে ও নতুন সময়ের উপযোগী করে শুরু করাই প্রজ্ঞাপ্রবাহের কাজ।
পরবর্তী বক্তা ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন স্বামী বিবেকানন্দর পৈতৃক আবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সম্পাদক ও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন আছি পরিষদের সদস্য শ্রীমৎ স্বামী জ্ঞানলোকাননাদজী মহারাজ। তিনি ধর্ম ও ধর্মের পার্থক্য চিহ্নিত করে বলেন, যা ধারণ ও রক্ষা করে তাই ধর্ম, যা ধ্বংস করে তা অধর্ম। মনুসংহিতা হতে (৬.৯৪) তিনি উল্লেখ করেন ধর্মের দশলক্ষ্মণের নির্দেশকারী শ্লোক:
ধৃতিঃ ক্ষমা দমো’স্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ ।
ধীবিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্ ॥
যার অর্থ ধৈর্য বা স্থিরতা ক্ষমাশীলতা, আত্মসংযম, চুরি না করা বা সততা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ, বিবেক, জ্ঞান, সত্যবাদিতা ও ক্রোধহীনতা এই দশটি হল ধর্মের লক্ষ্মণ। মহারাজ ভারতীয় জ্ঞানের দ্বারা সমাজকে জাগরিত করার অনুপ্রেরণা দিয়ে বলেন, যে চতুর্যুগের কথা আমরা জানি তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও উপস্থিত। যখন আমরা ঘুমোই তখন কলিযুগ, যখন জেগে উঠি তখন দ্বাপরযুগ, যখন নড়েচড়ে উঠি তখন ত্রেতাযুগ এবং যখন চলতে শুরু করি তখন সত্যযুগ। তিনি দশমহাবিদ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একের পর এক শ্লোক উল্লেখ করে আগত সকলকে নিজ নিজ কর্মে উজ্জীবিত করে তোলেন। মহাবিদ্যা সাধনা, যোগ, এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে যুক্ত মহাদেবীগণ প্রকৃতপক্ষে আদ্যাশক্তির বিভিন্ন প্রকাশ, যাঁদের প্রত্যেকে নির্দিষ্ট শক্তি, গুণ, এবং মহাজাগতিক কার্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। মহারাজ উদাত্ত কণ্ঠে বিষ্ণুর দশাবতারের বন্দনা উদ্ধৃত করে বলেন, আমাদের কর্তব্য হল নিজ নিজ জ্ঞানকে ব্রহ্মাণ্ডের বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডারে’র সঙ্গে সংযুক্ত করা। এবং ভারতের শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও নৈতিক আদর্শকেই তিনি ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরার প্রধান বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন, যা প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে অনন্তকাল সঞ্চারিত হয়ে এসেছে। মাতা নারায়নীর নিকট হতে রাষ্ট্রহিতে কাজ করার প্ররণাস্বর অর্জন করতে উপদেশ দিয়ে মহারাজ সকলকে অমূল্য আশীর্বচন প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানের অপর বক্তার আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন আইআইটি খড়্গপুরের প্রাক্তন নির্দেশক ডঃ বীরেন্দ্র কুমার তেওয়ারি। তিনি সরল ভাষায় ভারতীয় জ্ঞানের বিধিধ উজ্জ্বল প্রয়োগ তুলে ধরেন এবং নতুন শিক্ষানীতির (new education policy)’র নমনীয়তা ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে পঠনপাঠন চালান এবং ছাত্রছাত্রীদের এর সুফল অর্জনের ওপর গুরুত্ৱ আরোপ করেন। তবে প্রক্রিয়াটি ধীর ও দীর্ঘমেয়াদী, সুতরাং এর ফল লাভ করতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তের প্রান্ত সংঘচালক সারদাপ্রসাদ পাল ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরাকৈ প্রকৃত পক্ষে হিন্দু জ্ঞান পরম্পরা হিসেবে নামকরণের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তিনি হিপোক্রেটিস থেকে মহম্মদ ইবন মুসা আল খোয়ারিজমি প্রমুখ বিভিন্ন বিদেশি পণ্ডিতদের বিবরণে চিকিৎসাশাস্ত্র হতে গণিতবিদ্যা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মানবসভ্যতার প্রসারে হিন্দু জ্ঞানভাণ্ডারের অবদান তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের সমাপ্তিকালে লোকপ্রজ্ঞার রাজ্য সম্পর্ক প্রমুখ ডাঃ আশিস মণ্ডল ধন্যবাদজ্ঞাপনের শেষে ভারতের সীমানার অভ্যন্তরে উপস্থিত ভারতবিরোধী শক্তিকে প্রতিরোধ করার কাজে প্রজ্ঞাপ্রবাহের বৌদ্ধিক যোদ্ধাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেন, যাদের দেশের প্রয়াত প্রতিরক্ষা প্রধান বিপিন রাওয়াত ‘০.৫ ফ্রন্ট’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ বুদ্ধদেব সাউ। এই কার্যক্রমে লোকপ্রজ্ঞার প্রকাশনা ও প্রচার বিভাগ প্রজ্ঞাভাষ্যের ব্যবস্থাপনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করা হয়। যথা লোকপ্রজ্ঞার রাজ্য গবেষণা প্রমুখ ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার রচিত ‘শতাব্দীর সাধনায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’, লোকপ্রজ্ঞার মধ্যবঙ্গ প্রান্তের বিমর্শ প্রমুখ ডঃ জয়দেব বিশ্বাস অনূদিত ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: মহাভারতে যেরূপে প্রভাসিত, মূল রচনা - প্রোফেসর এ. আর বাসুদেব মূর্তি, ডঃ সত্যনারায়ণ মজুমদার সম্পাদিত ‘হিন্দুত্ব এক সামগ্রিক বিশ্লেষণ’ এবং ‘সংঘ শতবর্ষে তিন বৌদ্ধিকের বিষয় সূত্র’, ডঃ সৌমেন ঘোষ রচিত প্রশ্নোত্তরে ডঃ হেডগেওয়ার (ডাক্তারজী) ইত্যাদি।